আরও দেখুন
হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে পরিস্থিতি তীব্রভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, যার ফলে জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়ে গেছে। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে যে, ইরান ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। সোমবার রাতে ইরানের সামরিক বাহিনী এই বাণিজ্যিক জাহাজগুলো লক্ষ্য করে অন্তত দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে এবং মঙ্গলবার সকালের মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর তৃতীয় একটি জাহাজে হামলা চালায়। সামগ্রিকভাবে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার এই উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির বিষয়টি পূর্ববর্তী বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর থেকে ভিন্ন, যেগুলোর প্রতিটিকেই ট্রেডাররা একটি স্থানীয় ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করেছিল।
ইরানের হামলার জবাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর ছিল। দেশটির সরকারি প্রতিনিধিরা বলেছেন যে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের চলমান কার্যকলাপ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং এর পরিণতি ভোগ করতে হবে। এই বিষয়টি দ্রুতই বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, যখন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড তিনটি জাহাজে হামলার সরাসরি জবাব হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক শক্তিশালী হামলা শুরু করে। মার্কিন সরকারি বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হয় যে, ইরান বিনা উস্কানিতে আগ্রাসন চালিয়েছে, যা বিপজ্জনক এবং এটি যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। দীর্ঘকাল পর এই প্রথম সরাসরি স্বীকার করা হলো যে জুনের শেষে প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধবিরতি সত্যিকার অর্থেই লঙ্ঘিত হয়েছে।
একইসাথে, ওয়াশিংটন আর্থিক দিকটিকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ২১শে জুন জারি করা লাইসেন্সটি বাতিল করেছে, যাতে ২১শে আগস্ট পর্যন্ত ইরানের তেল, পেট্রোকেমিক্যাল এবং পেট্রোলিয়াম পণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ এবং বিক্রয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। এখন শুধুমাত্র ইতোমধ্যে অনুমোদিত কার্যক্রম গুটিয়ে আনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, এবং সেটাও ১৭ই জুলাই পর্যন্ত সীমিত করা হয়েছে। ৭ই জুলাইয়ের পর ইরানের তেল ক্রয় বা লোডিং সহ যেকোনো নতুন লেনদেনের উপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এটি একটি মৌলিক পরিবর্তন। এটা মনে রাখা দরকার যে, এই লাইসেন্স এবং এর সাথে যুক্ত শুল্কমুক্ত ৬০ দিনের সময়সীমাটি এই অঞ্চল থেকে সরবরাহ পুনরুদ্ধারের মূল ভিত্তি ছিল, যার উপর নির্ভর করে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো তেলের আরও দরপতনের পূর্বাভাস দিয়েছিল। তাই, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, গতকালও ব্যারেল প্রতি $69-এর নিচে থাকলেও আজ WTI-এর মূল্য বেড়ে $72.75-এ পৌঁছেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত লক্ষ্যবস্তুর তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে এবং হামলার ভৌগোলিক পরিধিও বিস্তৃত হচ্ছে। সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী একটি সৌদি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে এবং এই ধরনের হামলা ও তার পরিণতির জন্য তেহরানকে সম্পূর্ণভাবে দায়ী করেছে।
অন্যদিকে, ইরান পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে এবং হামলার দায়ভার সরাসরি জাহাজগুলোর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, তেহরানের সঙ্গে চুক্তিবিহীন পথে চলাচলকারী বা ট্র্যাকিং সিস্টেমে হস্তক্ষেপকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর উপর হামলার ঝুঁকি রয়েছে এবং নিরাপদে জাহজ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য ইরানের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে। এই বিবৃতিটি ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকারের বিষয়ে তেহরানের দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, যে বিষয়টি উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী গরিবাবাদিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন। মূলত, ইরান এই হামলাগুলোকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে না দেখিয়ে, হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের নিয়মকানুন প্রয়োগের পদক্ষেপ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ট্রেডারদের জন্য, এই ঘটনাপ্রবাহ চলমান উত্তেজনা প্রশমনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পুরো চিত্রটাই পাল্টে দিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ পুনরুদ্ধার, ওপেকপ্লাসের উৎপাদন কোটা বৃদ্ধি এবং সৌদি আরামকোর আগ্রাসী মূল্যছাড়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা তেলের দরপতনের পুরো কাঠামোটি এখন এক গুরুতর পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে। মূল প্রশ্ন হলো, ইরান কি আগের মতোই শুধু জাহাজের ওপর হামলা চালিয়ে লক্ষ্যবস্তুভিত্তিক পাল্টা হামলার শিকার হবে, নাকি এই সংঘাত আরও ব্যাপক আকার ধারণ করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের তেল রপ্তানির লাইসেন্স বাতিলকরণের বিষয়টি ইঙ্গিত দেয় যে, ওয়াশিংটন শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতেও বদ্ধপরিকর এবং প্রস্তুত।
জ্বালানি তেলের মূল্যের বর্তমান টেকনিক্যাল চিত্র অনুযায়ী, ক্রেতাদের জ্বালানি তেলের মূল্যকে নিকটস্থ রেজিস্ট্যান্স $73.79-এ নিয়ে যেতে হবে। এতে করে জ্বালানি তেলের মূল্যের $76.30-এর লক্ষ্যমাত্রার দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা ব্রেক করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং হবে। পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে $78.70 এরিয়া নির্ধারণ করা যেতে পারে। যদি তেলের দরপতন হয়, তাহলে মূল্য $71.70-এ থাকা অবস্থায় বিক্রেতারা মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে। তারা সফল হলে এই রেঞ্জ ব্রেক করে মূল্য নিম্নমুখী হলে সেটি বুলিশ পজিশনের উপর উল্লেখযোগ্য আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তেলের মূল্য $69.58 পর্যন্ত নেমে যেতে পারে, যেখানে পরবর্তীতে $67.22 পর্যন্ত দরপতনের সম্ভাবনাও রয়েছে।